কোনো ফলাফল পাওয়া যায়নি

    মহাবিশ্বের সীমানায় (পর্ব-০৫): বিগ ব্যাং ও সম্প্রসারণ

    মানব সভ্যতার ইতিহাসে সম্ভবত সবচেয়ে মৌলিক প্রশ্নটি হলো—এই মহাবিশ্বের শুরু কীভাবে হয়েছিল? প্রাচীন কাল থেকে মানুষ আকাশের দিকে তাকিয়ে তারা, গ্রহ, সূর্য ও চাঁদের গতিবিধি লক্ষ্য করেছে এবং নিজের অস্তিত্বের কারণ অনুসন্ধান করেছে। বিভিন্ন সভ্যতা, ধর্ম ও দর্শন এই প্রশ্নের ভিন্ন ভিন্ন উত্তর দিয়েছে। কিন্তু গত এক শতাব্দীতে বিজ্ঞান আমাদের এমন এক উত্তর দিয়েছে, যা কেবল বিস্ময়করই নয়, বরং নিখুঁত পর্যবেক্ষণ ও গাণিতিক মডেলের উপর প্রতিষ্ঠিত। সেই উত্তরটির নাম—বিগ ব্যাং তত্ত্ব।

    বিগব্যাং ও সম্প্রসারণ

    আজ থেকে প্রায় ১৩.৮ বিলিয়ন বছর আগে, মহাবিশ্বের সমস্ত পদার্থ ও শক্তি একটি অতি-উত্তপ্ত, অতি-ঘন বিন্দুতে সংকুচিত ছিল। সেই বিন্দু থেকে এক মহাবিস্ফোরণের মাধ্যমে শুরু হয়েছিল স্থান, কাল ও পদার্থের যাত্রা। এই ধারণা প্রথম শুনতে অবিশ্বাস্য মনে হলেও, গত কয়েক দশকে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা এমন সব প্রমাণ সংগ্রহ করেছেন, যা বিগ ব্যাং তত্ত্বকে আধুনিক সৃষ্টিতত্ত্বের ভিত্তিপ্রস্তরে পরিণত করেছে।

    এই পর্বে আমরা বিগ ব্যাং তত্ত্বের ইতিহাস, এর বৈজ্ঞানিক প্রমাণ, মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের রহস্য এবং ভবিষ্যতে মহাবিশ্বের কী হতে পারে তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।

    ১: মহাবিশ্ব সম্পর্কে প্রাচীন ধারণা থেকে আধুনিক সৃষ্টিতত্ত্বের পথে

    ১.১ প্রাচীন সভ্যতায় মহাবিশ্বের ধারণা

    প্রাচীন ব্যাবিলনীয়, মিশরীয়, গ্রিক, ভারতীয় ও চীনা সভ্যতায় মহাবিশ্বের গঠন ও উৎপত্তি নিয়ে বিচিত্র ধারণা প্রচলিত ছিল। গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটল মনে করতেন মহাবিশ্ব চিরন্তন ও অপরিবর্তনীয়—এর কোনো শুরু বা শেষ নেই। টলেমির ভূকেন্দ্রিক মডেলে পৃথিবী ছিল মহাবিশ্বের কেন্দ্রে, আর সূর্য, গ্রহ ও তারা ঘুরছে পৃথিবীর চারপাশে। এই ধারণা প্রায় ১৫০০ বছর ধরে পাশ্চাত্য জগতে প্রভাবশালী ছিল।

    ভারতীয় দর্শনে মহাবিশ্বের চক্রাকার সৃষ্টি ও ধ্বংসের ধারণা পাওয়া যায়। ঋগ্বেদের নাসদীয় সূক্তে (সৃষ্টির স্তোত্র) মহাবিশ্বের উৎপত্তি নিয়ে গভীর দার্শনিক প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে, যা আধুনিক সৃষ্টিতত্ত্বের বিমূর্ত ধারণাগুলোর সাথে বিস্ময়কর সাদৃশ্য বহন করে।

    ১.২ কোপারনিকান বিপ্লব ও আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের সূচনা

    ষোড়শ শতাব্দীতে নিকোলাস কোপারনিকাস সূর্যকেন্দ্রিক মডেল প্রস্তাব করে জ্যোতির্বিজ্ঞানে বিপ্লব ঘটান। পরবর্তীতে গ্যালিলিও গ্যালিলি দূরবীক্ষণ যন্ত্রের মাধ্যমে বৃহস্পতির চাঁদ, শুক্রগ্রহের দশা এবং সূর্যের কলঙ্ক পর্যবেক্ষণ করে কোপারনিকান মডেলকে সমর্থন করেন। ইয়োহানেস কেপলার গ্রহের গতির তিনটি সূত্র আবিষ্কার করেন এবং আইজ্যাক নিউটন মহাকর্ষ সূত্রের মাধ্যমে মহাজাগতিক বস্তুসমূহের গতি ব্যাখ্যা করেন।

    কিন্তু এই বিপ্লব সত্ত্বেও, মহাবিশ্বের উৎপত্তি নিয়ে বৈজ্ঞানিক ধারণা তখনও অপরিণত ছিল। নিউটন নিজেও বিশ্বাস করতেন মহাবিশ্ব অসীম ও চিরন্তন। বিংশ শতাব্দীর শুরু পর্যন্ত অধিকাংশ বিজ্ঞানী মনে করতেন মহাবিশ্ব স্থির—এর কোনো শুরু বা শেষ নেই।

    ২: বিগ ব্যাং তত্ত্বের জন্ম—এক যুগান্তকারী ধারণার সূচনা

    ২.১ আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা ও প্রথম ইঙ্গিত

    ১৯১৫ সালে আলবার্ট আইনস্টাইন তার সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব প্রকাশ করেন, যা মহাকর্ষকে স্থান-কালের বক্রতা হিসেবে ব্যাখ্যা করে। এই তত্ত্ব অনুসারে, স্থান-কাল স্থির নয়—এটি পদার্থ ও শক্তির উপস্থিতিতে বাঁকতে পারে, প্রসারিত বা সংকুচিত হতে পারে।

    আইনস্টাইন যখন তার সমীকরণগুলো সমগ্র মহাবিশ্বের উপর প্রয়োগ করলেন, তখন তিনি দেখতে পেলেন যে তার সমীকরণ অনুসারে মহাবিশ্ব হয় প্রসারিত হচ্ছে, নয়তো সংকুচিত হচ্ছে—কিন্তু স্থির থাকতে পারে না। যেহেতু তখনকার প্রচলিত ধারণা ছিল মহাবিশ্ব স্থির, তাই আইনস্টাইন তার সমীকরণে একটি অতিরিক্ত পদ যোগ করলেন, যাকে বলা হয় ‘মহাজাগতিক ধ্রুবক’ (Cosmological Constant)। এই ধ্রুবক মহাকর্ষের বিপরীতে কাজ করে মহাবিশ্বকে স্থির রাখত। পরবর্তীতে আইনস্টাইন এই সিদ্ধান্তকে তার জীবনের ‘সবচেয়ে বড় ভুল’ বলে আখ্যায়িত করেন।

    ২.২ আলেকজান্ডার ফ্রিদমান ও জর্জ ল্যমেত্র: সম্প্রসারণশীল মহাবিশ্বের তাত্ত্বিক ভিত্তি

    ১৯২২ সালে রুশ পদার্থবিজ্ঞানী আলেকজান্ডার ফ্রিদমান আইনস্টাইনের সমীকরণ থেকে এমন সমাধান বের করেন যা একটি সম্প্রসারণশীল মহাবিশ্বের পূর্বাভাস দেয়। ফ্রিদমান দেখান যে মহাবিশ্বের ভর-শক্তির ঘনত্বের উপর নির্ভর করে মহাবিশ্ব চিরকাল সম্প্রসারিত হতে পারে, অথবা একসময় সম্প্রসারণ থেমে গিয়ে সংকুচিত হতে শুরু করতে পারে।

    ১৯২৭ সালে বেলজীয় পদার্থবিজ্ঞানী ও যাজক জর্জ ল্যমেত্র স্বাধীনভাবে একই ধরনের সিদ্ধান্তে পৌঁছান। তিনি শুধু মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের পূর্বাভাসই দেননি, বরং প্রস্তাব করেন যে মহাবিশ্ব যদি সম্প্রসারিত হয়, তাহলে অতীতে কোনো এক সময়ে এটি একটি ‘আদি পরমাণু’ (Primeval Atom) থেকে যাত্রা শুরু করেছিল। এটিই ছিল বিগ ব্যাং তত্ত্বের প্রথম সুস্পষ্ট প্রস্তাবনা।

    ২.৩ এডউইন হাবল ও সম্প্রসারণের পর্যবেক্ষণিক প্রমাণ

    ১৯২৯ সালে মার্কিন জ্যোতির্বিজ্ঞানী এডউইন হাবল এক যুগান্তকারী আবিষ্কার করেন। ক্যালিফোর্নিয়ার মাউন্ট উইলসন মানমন্দিরের ১০০ ইঞ্চি হুকার দূরবীক্ষণ যন্ত্র ব্যবহার করে তিনি পর্যবেক্ষণ করেন যে দূরবর্তী ছায়াপথগুলো আমাদের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—কোনো ছায়াপথ যত বেশি দূরে, তার দূরে সরার গতি তত বেশি।

    হাবলের এই আবিষ্কার ‘হাবলের সূত্র’ নামে পরিচিত, যা বলে: v = H₀ × d (যেখানে v হলো ছায়াপথের দূরে সরার বেগ, d হলো ছায়াপথের দূরত্ব, এবং H₀ হলো হাবল ধ্রুবক)। এই সূত্র প্রমাণ করে যে মহাবিশ্ব সম্প্রসারিত হচ্ছে—ঠিক যেমনটি ফ্রিদমান ও ল্যমেত্র তাত্ত্বিকভাবে পূর্বাভাস দিয়েছিলেন।

    হাবলের আবিষ্কার বিগ ব্যাং তত্ত্বের পক্ষে প্রথম বড় পর্যবেক্ষণিক প্রমাণ হিসেবে কাজ করে। আইনস্টাইন নিজে ১৯৩১ সালে মাউন্ট উইলসন মানমন্দির পরিদর্শন করে হাবলের কাজের প্রশংসা করেন এবং স্বীকার করেন যে তার ‘মহাজাগতিক ধ্রুবক’ যোগ করা ভুল ছিল।

    ৩: বিগ ব্যাং তত্ত্বের স্তম্ভসমূহ—তিনটি প্রধান প্রমাণ

    ৩.১ মহাজাগতিক অণুতরঙ্গ পটভূমি বিকিরণ (Cosmic Microwave Background Radiation)

    বিগ ব্যাং তত্ত্বের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রমাণ হলো মহাজাগতিক অণুতরঙ্গ পটভূমি বিকিরণ, সংক্ষেপে CMB। ১৯৪৮ সালে জর্জ গ্যামো, রালফ আলফার ও রবার্ট হারম্যান ভবিষ্যদ্বাণী করেন যে বিগ ব্যাং-এর প্রায় ৩৮০,০০০ বছর পর, যখন মহাবিশ্ব যথেষ্ট ঠান্ডা হয়ে ইলেকট্রন ও প্রোটন মিলিত হয়ে প্রথম নিরপেক্ষ হাইড্রোজেন পরমাণু গঠন করে, তখন যে আলো নির্গত হয়েছিল তা আজও মহাবিশ্বে বিরাজ করছে—কিন্তু মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের কারণে সেই আলো এখন অণুতরঙ্গ তরঙ্গদৈর্ঘ্যে প্রসারিত হয়েছে।

    ১৯৬৪ সালে আর্নো পেনজিয়াস ও রবার্ট উইলসন বেল ল্যাবরেটরিজে একটি অতি-সংবেদনশীল রেডিও অ্যান্টেনা নিয়ে কাজ করার সময় একটি অদ্ভুত সমস্যার সম্মুখীন হন—তারা আকাশের সব দিক থেকে একটি সমরূপ অণুতরঙ্গ সংকেত পাচ্ছিলেন, যা তারা কোনোভাবেই দূর করতে পারছিলেন না। প্রথমে তারা ভেবেছিলেন এটি কবুতরের বিষ্ঠা বা অন্য কোনো স্থানীয় উৎস থেকে আসছে। কিন্তু পরে তারা বুঝতে পারেন যে এটি আসলে মহাবিশ্বের জন্মের সেই আদি আলো—CMB। এই আবিষ্কারের জন্য তারা ১৯৭৮ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।

    CMB-র আবিষ্কার বিগ ব্যাং তত্ত্বকে প্রায় অবিসংবাদিতভাবে প্রতিষ্ঠিত করে। পরবর্তীতে COBE, WMAP ও প্লাংক স্যাটেলাইটের মাধ্যমে CMB-র অত্যন্ত নিখুঁত মানচিত্র তৈরি করা হয়েছে, যা মহাবিশ্বের বয়স, গঠন ও বিবর্তন সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রদান করেছে।

    ৩.২ হালকা মৌলের প্রাচুর্য (Abundance of Light Elements)

    বিগ ব্যাং তত্ত্বের দ্বিতীয় প্রধান প্রমাণ হলো মহাবিশ্বে হাইড্রোজেন, হিলিয়াম ও লিথিয়ামের পর্যবেক্ষিত প্রাচুর্য। তত্ত্ব অনুসারে, বিগ ব্যাং-এর প্রথম কয়েক মিনিটে (যে সময়কে বলা হয় ‘বিগ ব্যাং নিউক্লিওসিন্থেসিস’ বা BBN) মহাবিশ্বের তাপমাত্রা ও ঘনত্ব এমন ছিল যে প্রোটন ও নিউট্রন মিলিত হয়ে হালকা পরমাণুর কেন্দ্রীণ (নিউক্লিয়াস) গঠন করতে সক্ষম হয়েছিল।

    BBN তত্ত্ব ভবিষ্যদ্বাণী করে যে এই প্রক্রিয়ায় মহাবিশ্বের মোট ভরের প্রায় ৭৫% হবে হাইড্রোজেন, প্রায় ২৫% হবে হিলিয়াম-৪, এবং অতি সামান্য পরিমাণে ডিউটেরিয়াম, হিলিয়াম-৩ ও লিথিয়াম-৭ উৎপন্ন হবে।

    জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে যে মহাবিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন তারা ও গ্যাস মেঘে হিলিয়ামের প্রাচুর্য BBN তত্ত্বের ভবিষ্যদ্বাণীর সাথে অসাধারণভাবে মিলে যায়। এই সাদৃশ্য বিগ ব্যাং তত্ত্বের পক্ষে আরেকটি শক্তিশালী প্রমাণ।

    ৩.৩ মহাবিশ্বের বৃহৎ-পরিসর গঠন (Large-Scale Structure of the Universe)

    তৃতীয় প্রধান প্রমাণ হলো মহাবিশ্বের বৃহৎ-পরিসর গঠন। ছায়াপথগুলো মহাবিশ্বে সমানভাবে ছড়িয়ে নেই—এরা সুতো, প্রাচীর ও শূন্য গহ্বরের এক জটিল জালিকা তৈরি করে। এই গঠন ব্যাখ্যা করতে হলে বিগ ব্যাং-এর একেবারে শুরুর দিকের অতি-ক্ষুদ্র কোয়ান্টাম ওঠানামা (Quantum Fluctuations)-কে দায়ী করতে হয়, যা মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের সাথে সাথে বিশাল আকার ধারণ করে এবং মহাকর্ষের প্রভাবে পদার্থ একত্রিত হয়ে ছায়াপথ ও ছায়াপথ স্তবক গঠন করে।

    কম্পিউটার সিমুলেশন দেখায় যে বিগ ব্যাং তত্ত্বের ভিত্তিতে মহাবিশ্বের বৃহৎ-পরিসর গঠন অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ব্যাখ্যা করা যায়।

    ৪: স্ফীতি তত্ত্ব—বিগ ব্যাং-এর প্রথম মুহূর্তের রহস্য

    ৪.১ স্ফীতি তত্ত্ব কেন প্রয়োজন?

    বিগ ব্যাং তত্ত্ব মহাবিশ্বের বিবর্তনের অনেক দিক ব্যাখ্যা করতে সক্ষম হলেও, কিছু মৌলিক প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেনি। যেমন:

    • দিগন্ত সমস্যা (Horizon Problem): মহাবিশ্বের বিপরীত প্রান্তের অঞ্চলগুলো কীভাবে একই তাপমাত্রায় পৌঁছাল, যেখানে আলোর গতিও তাদের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদানের জন্য যথেষ্ট সময় পায়নি?

    • সমতলতা সমস্যা (Flatness Problem): মহাবিশ্বের ঘনত্ব এত নিখুঁতভাবে ক্রান্তিক ঘনত্বের কাছাকাছি কেন, যার ফলে মহাবিশ্ব এত সমতল?

    • একচুম্বক সমস্যা (Monopole Problem): তত্ত্ব অনুসারে বিগ ব্যাং-এ প্রচুর পরিমাণে চৌম্বক একচুম্বক (Magnetic Monopole) উৎপন্ন হওয়ার কথা, কিন্তু বাস্তবে আমরা একটিও দেখতে পাইনি কেন?

    ৪.২ অ্যালান গুথ ও স্ফীতি তত্ত্বের প্রস্তাবনা

    ১৯৮০ সালে মার্কিন পদার্থবিজ্ঞানী অ্যালান গুথ উপরিউক্ত সমস্যাগুলোর সমাধান হিসেবে ‘স্ফীতি তত্ত্ব’ (Inflation Theory) প্রস্তাব করেন। এই তত্ত্ব অনুসারে, বিগ ব্যাং-এর ১০⁻³⁶ সেকেন্ড থেকে ১০⁻³² সেকেন্ডের মধ্যে মহাবিশ্ব এক অকল্পনীয় দ্রুতগতিতে সম্প্রসারিত হয়েছিল—যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘মহাজাগতিক স্ফীতি’ (Cosmic Inflation)।

    এই স্ফীতি পর্যায়ে মহাবিশ্বের আকার ১০²⁶ গুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছিল (একটি পরমাণুর চেয়ে ছোট থেকে একটি আঙ্গুর ফলের আকারে)। এই স্ফীতি দিগন্ত সমস্যার সমাধান করে, কারণ স্ফীতির আগে মহাবিশ্বের সমস্ত অঞ্চল পরস্পরের সংস্পর্শে ছিল এবং তাপীয় সাম্যাবস্থায় পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছিল। সমতলতা সমস্যারও সমাধান হয়, কারণ স্ফীতি মহাবিশ্বের বক্রতাকে প্রায় শূন্যে নিয়ে আসে। আর একচুম্বক সমস্যার সমাধান হয় এই কারণে যে স্ফীতির ফলে একচুম্বকগুলো এত দূরে ছড়িয়ে পড়ে যে আমাদের পর্যবেক্ষণযোগ্য মহাবিশ্বে একটিও থাকার সম্ভাবনা নেই।

    ৪.৩ স্ফীতি তত্ত্বের প্রমাণ

    স্ফীতি তত্ত্বের পক্ষে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রমাণ এসেছে CMB-র অতি-সূক্ষ্ম তাপমাত্রা তারতম্য থেকে। স্ফীতি তত্ত্ব ভবিষ্যদ্বাণী করে যে CMB-তে তাপমাত্রার এই ওঠানামাগুলো একটি নির্দিষ্ট পরিসংখ্যানিক প্যাটার্ন অনুসরণ করবে। COBE, WMAP ও প্লাংক স্যাটেলাইটের পর্যবেক্ষণ এই ভবিষ্যদ্বাণীকে অসাধারণ নিখুঁতভাবে নিশ্চিত করেছে।

    ৫: অন্ধকার শক্তি ও অন্ধকার পদার্থ—মহাবিশ্বের অদৃশ্য নিয়ন্তা

    ৫.১ অন্ধকার শক্তি কী এবং কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ?

    ১৯৯৮ সালে দুইটি স্বাধীন গবেষক দল—সুপারনোভা কসমোলজি প্রজেক্ট ও হাই-জেড সুপারনোভা সার্চ টিম—এক চমকপ্রদ আবিষ্কার করেন। তারা দূরবর্তী টাইপ Ia সুপারনোভা পর্যবেক্ষণ করে দেখতে পান যে মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ ধীর হওয়ার পরিবর্তে বরং ত্বরান্বিত হচ্ছে। এই আবিষ্কার ২০১১ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার লাভ করে।

    এই ত্বরিত সম্প্রসারণ ব্যাখ্যা করতে বিজ্ঞানীরা ‘অন্ধকার শক্তি’ (Dark Energy) নামক এক রহস্যময় শক্তির ধারণা প্রবর্তন করেন, যা মহাকর্ষের বিপরীতে কাজ করে মহাবিশ্বকে ক্রমবর্ধমান গতিতে সম্প্রসারিত করছে। বর্তমান মডেল অনুসারে, মহাবিশ্বের মোট ভর-শক্তির প্রায় ৬৮% হলো অন্ধকার শক্তি, ২৭% অন্ধকার পদার্থ, এবং মাত্র ৫% হলো সাধারণ পদার্থ (যা দিয়ে তারা, গ্রহ, ছায়াপথ ও আমরা নিজেরা গঠিত)।

    ৫.২ অন্ধকার পদার্থের রহস্য

    অন্ধকার পদার্থ (Dark Matter) হলো এমন এক ধরনের পদার্থ যা আলো বা অন্য কোনো তড়িৎচৌম্বক বিকিরণের সাথে মিথস্ক্রিয়া করে না, কিন্তু মহাকর্ষীয় প্রভাবের মাধ্যমে এর উপস্থিতি বোঝা যায়। ছায়াপথগুলোর ঘূর্ণন গতি, ছায়াপথ স্তবকের গঠন এবং মহাকর্ষীয় লেন্সিং-এর পর্যবেক্ষণ থেকে অন্ধকার পদার্থের অস্তিত্ব প্রমাণিত হয়েছে।

    অন্ধকার পদার্থের প্রকৃতি এখনও অজানা। এটি হতে পারে WIMPs (Weakly Interacting Massive Particles), অ্যাক্সিয়ন, অথবা অন্য কোনো অজানা কণা। বিশ্বের বিভিন্ন পরীক্ষাগারে (যেমন CERN-এর লার্জ হ্যাড্রন কলাইডার) বিজ্ঞানীরা অন্ধকার পদার্থ কণা শনাক্ত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

    ৬: মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের হার ও হাবল ধ্রুবক

    ৬.১ হাবল ধ্রুবকের গুরুত্ব

    হাবল ধ্রুবক (H₀) হলো মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের বর্তমান হার। এটি কিলোমিটার প্রতি সেকেন্ড প্রতি মেগাপারসেক (km/s/Mpc) এককে পরিমাপ করা হয়। হাবল ধ্রুবকের মান জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এর মাধ্যমে আমরা মহাবিশ্বের বয়স, আকার ও ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে পারি।

    ৬.২ হাবল টেনশন: একটি অমীমাংসিত রহস্য

    সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হাবল ধ্রুবকের মান নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ক দেখা দিয়েছে, যাকে বলা হয় ‘হাবল টেনশন’ (Hubble Tension)। প্রারম্ভিক মহাবিশ্বের পরিমাপ (যেমন CMB পর্যবেক্ষণ) থেকে প্রাপ্ত হাবল ধ্রুবকের মান হলো প্রায় ৬৭.৪ km/s/Mpc। অন্যদিকে, নিকটবর্তী মহাবিশ্বের পরিমাপ (যেমন সেফিড ভেরিয়েবল তারা ও সুপারনোভা ব্যবহার করে) থেকে প্রাপ্ত মান হলো প্রায় ৭৩ km/s/Mpc।

    এই দুই পরিমাপের মধ্যে পার্থক্য পরিসংখ্যানিক অনিশ্চয়তার চেয়ে অনেক বেশি, যা ইঙ্গিত দেয় যে হয় আমাদের পরিমাপ পদ্ধতিতে কোনো অজানা ত্রুটি রয়েছে, অথবা মহাবিশ্ব সম্পর্কে আমাদের বর্তমান ধারণায় (ΛCDM মডেল) কোনো মৌলিক পরিবর্তন প্রয়োজন। জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণ এই টানাপোড়েন আরও জটিল করেছে এবং নতুন পদার্থবিজ্ঞানের সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

    ৭: জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ ও নতুন দিগন্ত

    ৭.১ জেমস ওয়েব টেলিস্কোপের অবদান

    ২০২১ সালের ডিসেম্বরে উৎক্ষিপ্ত জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ (JWST) মহাবিশ্ব পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রে এক নতুন যুগের সূচনা করেছে। এর অবলোহিত (ইনফ্রারেড) দৃষ্টি বিজ্ঞানীদের মহাবিশ্বের একেবারে প্রারম্ভিক যুগের ছায়াপথগুলো পর্যবেক্ষণ করতে সক্ষম করেছে, যা আগে কখনো সম্ভব ছিল না।

    JWST-এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার হলো বিগ ব্যাং-এর মাত্র ৩০০-৪০০ মিলিয়ন বছর পরেও পূর্ণাঙ্গ ছায়াপথের অস্তিত্ব। এই ছায়াপথগুলো এত দ্রুত গঠিত হয়েছে যে তা মহাবিশ্বের গঠন সম্পর্কে আমাদের প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করছে। বিজ্ঞানীরা এখন এই ‘অসম্ভব প্রারম্ভিক ছায়াপথ’ ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করছেন, যা হয়তো মহাবিশ্বের প্রারম্ভিক ইতিহাস সম্পর্কে নতুন তথ্য প্রদান করবে।

    ৭.২ সাম্প্রতিক আবিষ্কার ও বিতর্ক

    ২০২৪-২৫ সালে JWST থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিজ্ঞানীদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছে। কিছু গবেষক দাবি করছেন যে প্রারম্ভিক ছায়াপথগুলোর পর্যবেক্ষণ বিগ ব্যাং তত্ত্বের সাথেই সামঞ্জস্যপূর্ণ, কিন্তু ছায়াপথ গঠনের প্রক্রিয়া সম্পর্কে আমাদের ধারণায় পরিবর্তন প্রয়োজন। অন্যদিকে কেউ কেউ প্রস্তাব করছেন যে হয়তো মহাবিশ্বের বয়স আমাদের ধারণার চেয়ে বেশি, অথবা অন্ধকার শক্তির প্রকৃতি ভিন্ন।

    ৮: মহাবিশ্বের ভবিষ্যৎ—শেষ পরিণতি কী?

    ৮.১ বিগ ফ্রিজ, বিগ ক্রাঞ্চ নাকি বিগ রিপ?

    মহাবিশ্বের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে এর সম্প্রসারণের হারের উপর, যা আবার নির্ভর করে অন্ধকার শক্তির প্রকৃতি ও মহাবিশ্বের মোট ঘনত্বের উপর। বর্তমানে তিনটি প্রধান সম্ভাব্য পরিণতি বিবেচনা করা হয়:

    1. বিগ ফ্রিজ (Big Freeze) বা তাপীয় মৃত্যু: যদি অন্ধকার শক্তি ধ্রুবক থাকে এবং মহাবিশ্ব চিরকাল সম্প্রসারিত হতে থাকে, তাহলে শেষ পর্যন্ত সমস্ত তারা জ্বালানি ফুরিয়ে নিভে যাবে, ছায়াপথগুলো একে অপর থেকে এত দূরে সরে যাবে যে কোনো নতুন তারা গঠিত হবে না, এবং মহাবিশ্ব এক শীতল, অন্ধকার ও প্রাণহীন অবস্থায় পৌঁছাবে। বর্তমান পর্যবেক্ষণ অনুসারে এটাই সবচেয়ে সম্ভাব্য পরিণতি।

    2. বিগ ক্রাঞ্চ (Big Crunch): যদি মহাবিশ্বের ঘনত্ব ক্রান্তিক ঘনত্বের চেয়ে বেশি হয়, তাহলে সম্প্রসারণ একসময় থেমে গিয়ে সংকোচন শুরু হবে। মহাবিশ্ব ক্রমশ সংকুচিত হয়ে আবার সেই আদি সিঙ্গুলারিটিতে ফিরে যাবে—ঠিক বিগ ব্যাং-এর বিপরীত প্রক্রিয়া।

    3. বিগ রিপ (Big Rip): যদি অন্ধকার শক্তি সময়ের সাথে বৃদ্ধি পায় (ফ্যান্টম এনার্জি), তাহলে সম্প্রসারণ এত দ্রুত হবে যে শেষ পর্যন্ত ছায়াপথ, তারা, গ্রহ, পরমাণু—এমনকি স্থান-কাল নিজেই ছিন্নভিন্ন হয়ে যাবে।

    ৮.২ আমরা কোন পথে?

    বর্তমান পর্যবেক্ষণ অনুসারে, মহাবিশ্বের মোট ঘনত্ব ক্রান্তিক ঘনত্বের অত্যন্ত কাছাকাছি, এবং অন্ধকার শক্তি ধ্রুবক বলে মনে হচ্ছে। এর অর্থ হলো মহাবিশ্ব সম্ভবত চিরকাল সম্প্রসারিত হতে থাকবে এবং বিগ ফ্রিজ পরিণতির দিকে এগিয়ে যাবে। তবে অন্ধকার শক্তির প্রকৃতি সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান এখনও অসম্পূর্ণ, তাই নিশ্চিত করে কিছু বলা সম্ভব নয়।

    ৯: বিকল্প তত্ত্ব ও সমালোচনা

    ৯.১ স্থির অবস্থা তত্ত্ব (Steady State Theory)

    ১৯৪৮ সালে ফ্রেড হয়েল, থমাস গোল্ড ও হারমান বন্ডি ‘স্থির অবস্থা তত্ত্ব’ প্রস্তাব করেন, যা বলে মহাবিশ্বের কোনো শুরু বা শেষ নেই—এটি চিরন্তন ও অপরিবর্তনীয়। এই তত্ত্ব অনুসারে, মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের ফলে সৃষ্ট শূন্যতা পূরণ করতে প্রতিনিয়ত নতুন পদার্থ সৃষ্টি হচ্ছে। কিন্তু CMB-র আবিষ্কার এই তত্ত্বকে কার্যত অপ্রাসঙ্গিক করে দেয়, কারণ CMB হলো মহাবিশ্বের একটি ‘শুরু’ থাকার সরাসরি প্রমাণ।

    ৯.২ চক্রাকার মহাবিশ্ব ও মাল্টিভার্স

    কিছু আধুনিক তত্ত্ব প্রস্তাব করে যে মহাবিশ্ব চক্রাকারে বিগ ব্যাং ও বিগ ক্রাঞ্চের মাধ্যমে সৃষ্টি ও ধ্বংস হচ্ছে। স্ট্রিং তত্ত্ব থেকে উদ্ভূত ‘একপাইরোটিক’ (Ekpyrotic) মডেলও চক্রাকার মহাবিশ্বের ধারণা দেয়।

    আরেকটি চিত্তাকর্ষক ধারণা হলো ‘মাল্টিভার্স’ বা বহুবিশ্ব—যেখানে আমাদের মহাবিশ্ব অসংখ্য মহাবিশ্বের একটি মাত্র, এবং প্রতিটি মহাবিশ্বের ভিন্ন ভিন্ন ভৌত ধ্রুবক ও বৈশিষ্ট্য থাকতে পারে। স্ফীতি তত্ত্ব স্বাভাবিকভাবেই মাল্টিভার্স ধারণার দিকে পরিচালিত করে, যদিও এটি পরীক্ষামূলকভাবে প্রমাণ করা বর্তমানে সম্ভব নয়।

    অসীমের পথে এক ক্ষুদ্র পদচিহ্ন

    বিগ ব্যাং তত্ত্ব ও মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের কাহিনি মানব জিজ্ঞাসা ও বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের এক অসাধারণ মহাকাব্য। মাত্র এক শতাব্দী আগেও আমরা জানতাম না যে মহাবিশ্বের কোনো শুরু আছে। আজ আমরা জানি যে ১৩.৮ বিলিয়ন বছর আগে এক মহাবিস্ফোরণের মাধ্যমে স্থান, কাল ও পদার্থের যাত্রা শুরু হয়েছিল। আমরা জানি যে মহাবিশ্ব এখনও সম্প্রসারিত হচ্ছে, এবং এই সম্প্রসারণ ক্রমশ ত্বরান্বিত হচ্ছে এক রহস্যময় অন্ধকার শক্তির প্রভাবে।

    কিন্তু আমাদের জ্ঞান এখনও অসম্পূর্ণ। অন্ধকার পদার্থ ও অন্ধকার শক্তির প্রকৃতি কী? স্ফীতি ঠিক কীভাবে ঘটেছিল? মহাবিশ্বের শেষ পরিণতি কী হবে? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বিজ্ঞানীরা কাজ করে যাচ্ছেন। জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের মতো অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি আমাদের দৃষ্টিকে মহাবিশ্বের আরও গভীরে, আরও প্রাচীন অতীতে নিয়ে যাচ্ছে।

    আরও পড়ুন-
    মহাবিশ্বের সীমানায় (পর্ব-০৪): সুপারনোভা থেকে কৃষ্ণগহ্বর
    মহাবিশ্বের সীমানায় (পর্ব-০৩): সৌরজগৎ
    মহাবিশ্বের সীমানায় (পর্ব-০২): টেলিস্কোপের বিপ্লব
    মহাবিশ্বের সীমানায় (পর্ব-০১): প্রাচীন জ্যোতির্বিজ্ঞান

    #বিগব্যাং #মহাবিশ্ব #সম্প্রসারণ #BigBang #Universe #Cosmology #Astronomy #DarkEnergy #DarkMatter #Hubble #JamesWebbSpaceTelescope #CMB #Inflation #BanglaScience #বাংলাবিজ্ঞান #জ্যোতির্বিজ্ঞান #সৃষ্টিতত্ত্ব #মহাজাগতিক #আইনস্টাইন #হাবল #স্পেস #Science #Physics #Astrophysics

    একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

    নবীনতর পূর্বতন

    نموذج الاتصال